• ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা

    ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা

  • 1
  • ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা কী

    এটা এমন একটি পরিস্থিতি যাতে আপনার দুধ বা দুগ্ধজাত পণ্য (যাকে ডেয়রি পণ্যও বলা হয়) হজম করা মুশকিল হয়ে পড়ে। আপনার যদি ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা থাকে এবং আপনি ডেয়ারি পণ্য খান, তাহলে আপনার ডায়েরিয়া, পেটে যন্ত্রণা ও গ্যাস হতে পারে।

    ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা যে কারোরই হতে পারে। তবে এটা আদি আমেরিকান, এশীয়, এশীয় ভারতীয় ও কালো মানুষের ক্ষেত্রে খুবই সাধারণ ব্যাপার।

    যাদের ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা নেই, তাদের শরীরে ‘ল্যাকটেজ’ নামক প্রোটিন তৈরি হয় যা দুধের মধ্যে উপলব্ধ শর্করার মূল রূপ ল্যাকটোজকে ভেঙে ফেলে। যাদের ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা রয়েছে, তাদের শরীর যথেষ্ট পরিমাণে এনজাইম তৈরি করে না অথবা যতটা করা উচিত ততটা ভালোভাবে এনজাইম কাজ করে না। এছাড়াও কিছু সংক্রমণ, যেমন আপনার খাবারে বিষক্রিয়া হতে পারে, এনজাইমের ক্ষতি করতে পারে। তবে যদি এমনটা হয় সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সমস্যা চলে যায়। সৌভাগ্যবশত, ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা রয়েছে এমন মানুষ তাদের সমস্যার সুরাহায় একটা এনজাইম সম্পূরক নিতে পারেন।

  • ল্যাকটোজ হজম না হওয়া কতটা সাধারণ ব্যাপার

    ভারতে মোটামুটি 60 থেকে 70শতাংশ মানুষ ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যায় ভোগে। উত্তর ভারতের তুলনায় দক্ষিণ ভারতে সুস্থ জনসংখ্যার মধ্যে এর সংখ্যা বেশি। উত্তর ভারতীয়দের মধ্যে সমস্যা কম হওয়ার কারণ হয়তো এরা আর্যদের বংশধর যারা দীর্ঘসময় ধরে দুগ্ধ উৎপাদন করে আসছে এবং দুধ হজমে সক্ষম বলে পরিচিত। তাই এই জিনগত মিশ্রণ এদের শরীরে ল্যাকটোজ হজম হওয়ার ক্ষেত্রে দায়ী।

    গোটা বিশ্বে ল্যাকটোজ শোষণের মাত্রা ইউরোপীয়দের মধ্যেই সর্বাধিক। আফ্রিকান, এশিয়ান, আফ্রিকান-আমেরিকানদের মধ্যে ল্যাকটোজের হজম ক্ষমতার হার কম এবং কমবয়সে তাঁদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথেই এই হজম ক্ষমতা কমতে থাকে। বৃদ্ধ বয়সে এটা সবচেয়ে কমে যায়।

  • ল্যাকটোজ না হজম হওয়ার কারণ কী কী

    ক্ষুদ্রান্ত্র যখন ল্যাকটেজ নামে একটা এনজাইম যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদন করে না তখনই ল্যাকটোজ হজম না হওবার সমস্যা ঘটে। আপনার শরীরে ল্যাকটোজ (ডেয়ারি পণ্যে উপলব্ধ শর্করা)কে ভাঙা, বা হজম করা জরুরী।

    সাধারণত বয়স বাড়ার সাথে সাথে ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা তৈরি হয়। মানুষ তাদের কিশোর বয়সে বা বয়সকালে (30 থেকে 40 বছর) ল্যাকটোজ অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে। সাধারণত ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা বংশগত হয় এবং পরিবারের জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা সংক্রমণ, কেমোথেরাপি, পেনিসিলিন প্রতিক্রিয়া, অস্ত্রোপচার, গর্ভাবস্থা বা দীর্ঘ সময় ধরে ডেয়ারি পণ্য না খাওবার কারণেও হতে পারে। এছাড়াও নির্দিষ্ট কিছু জাতির মধ্যে অন্যদের তুলনায় ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যার সম্ভাবনা বেশি হয়।

    বিরলতম ক্ষেত্রে নবজাতক শিশুদের ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা হতে পারে। সাধারণত নবজাতকদের মধ্যে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই সমস্যা কেটে জায়।

  • ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার উপসর্গ কী

    এই উপসর্গগুলি কেবলমাত্র তখনই হয় যখন আপনি দুধ বা কোনো ডেয়ারি পণ্য খান। এগুলির মধ্যে রয়েছে:

    • পেটে যন্ত্রনা
    • পেট ফোলা
    • পেটে গুড়গুড় শব্দ
    • গ্যাস
    • বমি বমি ভাব
    • বমি
    • ডায়েরিয়া
  • ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার জটিলতাগুলি কী

    দুধের মতো ডেয়ারি পণ্য একটা স্বাস্থ্যকর আহারের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এগুলির মধ্যে ক্যালসিয়াম, প্রোটিন এবং ভিটামিন এ, বি12 ও ডি-র মতো ভিটামিনগুলি থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ক্যালসিয়ামের প্রস্তাবিত দৈনিক বরাদ্দ (আরডিএ) হলো 700মিলিগ্রাম।

    এছাড়াও ল্যাকটোজ গুরুত্বপূর্ণ কারণ আপনার শরীরকে ম্যাগনেসিয়াম ও জিঙ্ক সহ অন্যান্য অসংখ্য খনিজ শোষণ করতে এটা আপনাকে সাহায্য করে। শক্তিশালী, সুস্থ হাড়ের বিকাশের জন্য এই ভিটামিন ও খনিজগুলি গুরুত্বপূর্ণ।

    আপনার যদি ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা হয়, তাহলে আপনার শরীরের ভিটামিন ও মিনারেলগুলির আরডিএ পাওয়া মুশকিল হতে পারে। এর ফলে আপনার নিচের পরিস্থিতিগুলি হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।

    • অস্টিওপেনিয়া, एএমন একটা অবস্থা যেখানে আপনার হাড়ের ঘনত্ব খুব কমে যায়। এই অস্টিওপেনিয়ার চিকিৎসা না করলে তা থেকে অস্টিওপোরোসিস হতে পারে।
    • অস্টিওপোরোসিস, এটা এমন একটা পরিস্থিতি যার কারণে আপনার হাড় পাতলা ও দুর্বল হয়ে যায়। আপনার অস্টিওপোরোসিস থাকলে আপনার হাড়ে চিড় ধরা ও হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
    • অপুষ্টি আপনি যে খাবার খাচ্ছেন তা যদি আপনার শরীরের সুস্থ কার্যকলাপের জন্য জরুরী পুষ্টিগুলি না দেয় তাহলেই অপুষ্টি হয়। আর আপনি অপুষ্ট হলে ক্ষত সারতে অনেক বেশি সম লাগতে পারে এবং আপনি ক্লান্ত বা হতাশ বোধ করতে পারেন।
    • ওজন হ্রাস। . अঅত্যধিক ওজন কমলে তা আপনার স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে, এবং তা থেকে অস্টিওপোরোসিসের মতো পরিস্থিতি হতে পারে।
  • ল্যাকটোজ হজম না হওয়া কি মূলত খাওয়ার একটা অ্যালার্জি?

    না। কিছু লোকের দুধ আর ডেয়ারি পণ্য থেকে অ্যালার্জি হয়। তবে কোনো ডেয়ারি অ্যালার্জি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ল্যাকটোজ হজমের সমস্যার থেকে আলাদা হয়। এই ধরনের অ্যালার্জির ক্ষেত্রে শরীর দুধের শর্করার বদলে দুধের প্রোটিনের উপর প্রতিক্রিয়া করে। উপরন্তু, অ্যালার্জির সঙ্গে শরীরের সংক্রমণের সঙ্গে লড়াইয়ের তন্ত্র প্রভাবিত হয়, যাকে রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা বলা হয় যেখানে ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা হয় না।

  • ল্যাকটোজের ঘাটতি/ল্যাকটোজের হজম না হওবার সমস্যা খুঁজতে কি কোনো পরীক্ষা আছে?

    ল্যাকটোজ ঘাটতি নির্ণয়

    • H2 শ্বাস পরীক্ষা: বাতাসে ছাড়া প্রশ্বাসে H2 সনাক্তকরণ কারণ অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়া ল্যাকটোজ নির্মাণকারী হাইড্রোজেন (H2) ব্যবহার করে। 50 গ্রাম ল্যাকটোজেন নেওয়ার পর শ্বাসে হাই্ড্রোজেন > 20 পিপিএম (50 প্রতি দশ লক্ষে) হলে এটা নিশ্চিত হয়।
    • ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার পরীক্ষা (এলটিটি): রক্ত গ্লুকোজে কম বা অনুপস্থিতির সনাক্ত করা। একটা অস্বাভাবিক এলটিটি-র অর্থ হলো 50 গ্রাম ল্যাকটোজ লোড দেওয়ার তিরিশ মিনিট পর রক্তে গ্লুকোজ না বাড়া।
    • মলে অম্ল পরীক্ষা: মল পিএইচ পরীক্ষা করা কারণ হজম না হওয়া ল্যাকটোজের গাঁজাইয়া তুলে ল্যাকটিক অ্যাসিড ও অন্যান্য অ্যাসিড তৈরি হয় যা মলের নমুনায় থাকতে পারে
    • নতুন পরীক্ষা: রক্ত বা লালার জিনেটিক পরীক্ষা

    ল্যাকটোজ হজম না সমস্যা নির্ণয়

    • ল্যাকটোজ চ্যালেঞ্জ টেস্ট: একেবারেই বাড়িতে 500মিলিলিটার দুধ (25গ্রাম ল্যাকটোজ) খান, তারপর 1-3ঘন্টা কিছু খাবেন না। যদি আপনার পেটে ব্যথা, গ্যাস, খিঁচুনি, পেট ফোলা বা ডায়েরিয়া হয়, তাহলে আপনার ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা থাকতে পারে।
  • আমার কি ডাক্তারকে দেখানো উচিত?

    হ্যাঁ। আপনার যদি মনে হয় যে আপনার ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা রয়েছে তাহলে তা আপনার ডাক্তারকে বলুন। আপনার অন্য কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা তা সুনিশ্চিত হতে তিনি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারেন।

  • ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যার চিকিৎসা কীভাবে করা হয়?

    বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, লোকে ল্যাকটোজের উৎস ছাঁটাই বা তা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে এবং তার বদলে ল্যাকটোজ-মুক্ত বিকল্প খাওয়া শুরু করে কিন্তু এই মানুষগুলির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যার ব্যাপার হলো এটা নিশ্চিত করা যাতে তাঁদের ডেয়ারি পণ্যে উপলব্ধ পুষ্টিগুলি বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাসিয়াম, প্রোটিন ও রিবোফ্লেবিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া। মহিলাদের ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটা হাড়কে শক্তিশালী করে এবং অস্টিওপোসরোসিসের ঝুঁকি কমায়। এই কারণে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য এড়ানো কোনোভাবে সুপারিশ করা হয় না।

    ল্যাকটোজ যুক্ত পণ্য কম খেলে বা পুরোপুরি এড়িয়ে চলার মানে আপনি আপনার আহারে কিছু ভিটামিন ও খনিজের মাত্রা কমিয়ে দচ্ছেন এবং তাতে আপনার অন্য জটিলতা বেড়ে যেতে পারে।

    ল্যাকটেজ এনজাইম ট্যাবলেট বা ড্রপের মতো ল্যাকটেজ সম্পূরক আপনার ক্ষুদ্রান্ত্রে যে ল্যাকটেজ তৈরি হচ্ছে না তার অভাব পূরণ করে, এবং এর ফলে আপনার খাবারের যে কোনো ল্যাকটোজ আরো সহজভাবে ভেঙে ফেলতে সাহায্য করে আপনার উপসর্গগুলি কমাতে পারে। এগুলি দুধের সঙ্গে মিশিয়ে বা ল্যাকটোজ রয়েছে এমন খাবার খাওয়ার আগে খাওয়া যেতে পারে। তবে এটা জানা জরুরী যে প্রত্যেকটি পণ্য এক একজন লোকের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদাভাবে কাজ করে। উপরন্তু, কোনো কিছু ল্যাকটোজের প্রত্যেকটা শেষ অংশটা ভাঙতে পারে না, তাই এনজাইম সম্পূরক নেওয়ার পরও কিছু লোকের কিছু কিছু উপসর্গ থেকে যায়।

    ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার সমস্যা প্রাকৃতিক ও নিরাপদ উপায়ে সামলাতে ভারতে প্রথম বারের জন্য ইয়ামু ট্যাবলেট (ল্যাকটেজ এনজাইম চিউয়েবল ট্যাবলেট) পেশ করা হয়েছে যা ল্যাকটোজকে ভেঙে ফেলতে সাহায্য করে এবং এইভাবে ল্যাকটোজ হজম না হওয়ার উপসর্গ দূর করতে সহায়ক হয়।